NASA: ডাইনোসরদের বিলুপ্তির পেছনে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাত ছিল—এমন মত দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের। সেই ইতিহাসের কথা মাথায় রেখেই আজও মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো বিপুল আকারের পাথুরে বস্তুগুলিকে ঘিরে উদ্বেগ কাটছে না। গবেষকদের আশঙ্কা, যদি অতিকায় কোনও গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে, তবে তার অভিঘাত হবে শত শত পরমাণু বিস্ফোরণের সমান। শুধু তা-ই নয়, সংঘর্ষের পর বায়ুমণ্ডলে ধুলো ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে সূর্যালোক দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা হ্রাস, আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং খাদ্যশৃঙ্খলের ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বহু অঞ্চল বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে এবং প্রাণহানির পরিমাণ হতে পারে বিপর্যয়কর।
তবে সব গ্রহাণুই যে পৃথিবী ধ্বংসের কারণ হবে, তা নয়। বিশালাকার গ্রহাণুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং তাদের অধিকাংশই আগেভাগে শনাক্ত করা গেছে। কিন্তু মাঝারি মাপের গ্রহাণুগুলিই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এদের আকার এতটাই বড় যে কোনও শহরের উপর পড়লে পুরো নগরী নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, অথচ এত ছোটও যে সবসময় নজরে পড়ে না।(NASA)
সম্প্রতি ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স’-এর সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে Kelly Fast এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পৃথিবীর কক্ষপথের আশপাশে অন্তত ১৫ হাজারেরও বেশি ‘নিয়ার আর্থ অবজেক্ট’ বা পৃথিবীর নিকটবর্তী মহাজাগতিক বস্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের ব্যাস ১৪০ মিটার বা তার বেশি।
‘নিয়ার আর্থ অবজেক্ট’ বলতে সেই সব গ্রহাণু বা ধূমকেতুকে বোঝায়, যেগুলি অন্য গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে কক্ষপথ পরিবর্তন করে পৃথিবীর কাছে চলে আসে। এদের মধ্যে যাদের ভবিষ্যতে পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষের সামান্য সম্ভাবনাও রয়েছে, তাদের ‘নিয়ার আর্থ অ্যাস্টরয়েড’ (NEA) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই শ্রেণির বস্তুগুলির গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে NASA এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থা।
কেলি ফাস্ট জানান, ১৪০ মিটার বা তার বেশি ব্যাসের গ্রহাণুগুলির মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, বাকি বৃহৎ সংখ্যক সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু এখনও অজানা। খুব বড় গ্রহাণুগুলি তুলনামূলক সহজে ধরা পড়ে, কারণ তারা আকাশে উজ্জ্বল ও স্পষ্ট। আবার খুব ছোট গ্রহাণু প্রায়ই বায়ুমণ্ডলে ঢুকে ভেঙে যায় বা সামান্য ক্ষতি করে। কিন্তু মাঝারি আকারের বস্তুগুলি সবচেয়ে বিপজ্জনক—কারণ এরা শনাক্ত করা কঠিন, অথচ আঘাত করলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম।
ইতিহাস বলছে, অতীতে বহুবার এই ধরনের গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছে এবং গ্রহের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে এক বিশাল গ্রহাণুর অভিঘাতেই ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটে বলে অধিকাংশ বিজ্ঞানীর ধারণা। সেই ঘটনার পর পৃথিবীর পরিবেশে আমূল পরিবর্তন আসে এবং নতুন প্রাণপ্রজাতির বিকাশের পথ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গুজব ও আতঙ্ক ছড়ালেও, বিজ্ঞানীরা নিয়মিত নজরদারি এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির মাধ্যমে সম্ভাব্য বিপদ কমানোর চেষ্টা করছেন। গ্রহাণুর গতিপথ নির্ণয়, কক্ষপথ পরিবর্তনের কৌশল উদ্ভাবন এবং প্রতিরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি চলছে। তবুও, এখনও বহু বস্তু সম্পূর্ণভাবে মানচিত্রে ধরা না পড়ায় সতর্কবার্তা জারি থাকছে।
সংক্ষিপ্তসার (NASA)
বিজ্ঞানীদের মতে, বৃহৎ বা মাঝারি আকারের গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হানলে তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। বর্তমানে পৃথিবীর আশপাশে হাজার হাজার ‘নিয়ার আর্থ অবজেক্ট’ ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের একটি বড় অংশ এখনও শনাক্ত হয়নি। বিশেষত মাঝারি মাপের গ্রহাণু সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ। মহাকাশ সংস্থাগুলি নজরদারি জোরদার করলেও সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।(NASA)
















Leave a Reply